Skip to main content

সূরা আম্বিয়া শ্লোক 87

وَذَا
আর অধিকারী
ٱلنُّونِ
মাছের (স্মরণ করো)
إِذ
যখন
ذَّهَبَ
চলে গিয়েছিলো
مُغَٰضِبًا
রাগ করে
فَظَنَّ
অতঃপর মনে করেছিলো
أَن
যে
لَّن
না
نَّقْدِرَ
ধড়-পাকড় করতে পারবো
عَلَيْهِ
তার উপর
فَنَادَىٰ
অতঃপর সে ডেকেছিলো
فِى
মধ্যে
ٱلظُّلُمَٰتِ
অন্ধকারের
أَن
যে
لَّآ
"নেই
إِلَٰهَ
কোন ইলাহ
إِلَّآ
ছাড়া
أَنتَ
তুমি
سُبْحَٰنَكَ
তুমি পবিত্র মহান
إِنِّى
নিশ্চয়ই আমি
كُنتُ
ছিলাম
مِنَ
অন্তর্ভুক্ত
ٱلظَّٰلِمِينَ
সীমালঙ্ঘনকারীদের"

তাফসীর তাইসীরুল কুরআন:

স্মরণ কর যুন্-নুন এর কথা- যখন সে গোস্বাভরে চলে গিয়েছিল, আর ভেবেছিল যে তার উপর আমার কোন ক্ষমতা খাটবে না। অতঃপর সে (সমুদ্রের) গভীর অন্ধকার থেকে ডেকেছিল যে, তুমি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তোমারই পবিত্রতা, মহিমা ঘোষণা করছি; বাড়াবাড়ি আমিই করেছি।

1 আহসানুল বায়ান | Tafsir Ahsanul Bayaan

আর (স্মরণ কর) যুন-নুন[১] (মাছ-ওয়ালা ইউনুস)এর কথা, যখন সে ক্রোধভরে বের হয়ে গেল এবং মনে করল, আমি তার প্রতি কোন সংকীর্ণতা করব না।[২] অতঃপর সে অনেক অন্ধকার[৩] হতে আহবান করল, ‘তুমি ছাড়া কোন (সত্য) উপাস্য নেই; তুমি পবিত্র, মহান। নিশ্চয় আমি সীমালংঘনকারী।’

[১] 'যুন-নূন' (মাছ-ওয়ালা) বলতে ইউনুস (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে, যিনি নিজের জাতির উপর রাগান্বিত হয়ে এবং তাদেরকে আল্লাহর আযাবের ভয় দেখিয়ে, আল্লাহর বিনা অনুমতিতে সেখান হতে পলায়ন করেছিলেন। যার কারণে আল্লাহ তাঁকে পাকড়াও করলেন এবং এক বড় তিমি মাছ তাঁকে গিলে ফেলল। এর কিছু বিবরণ সূরা ইউনুসের ১০;৯৮ নং আয়াতের টীকায় বর্ণিত হয়েছে এবং কিছু বর্ণনা সূরা সাফফাতে ৩৭;১৩৯-১৪৮ নং আয়াতে আসবে।

[২] অধিকাংশ অনুবাদে বলা হয়েছে, 'আমি তার উপর কোন ক্ষমতাই রাখি না।' বা 'আমি তাকে পাকড়াও করতে পারব না।' আল্লাহর প্রতি এমন ধারণা কুফরী এবং একজন নবী এমন ধারণা করতে পারে না। সুতরাং এর সঠিক মর্মার্থ হল, 'সে মনে করল, আমি তার প্রতি কোন সংকীর্ণতা সৃষ্টি করব না' অথবা 'সে ধারণা করল, আমি তার জন্য কোন শাস্তির ফায়সালা করব না।' (ফাতহুল ক্বাদীর)

[৩] ظُلمَات শব্দটি ظُلمَة শব্দের বহুবচন যার অর্থঃ অনেক অন্ধকার। ইউনুস (আঃ) বেশ কয়েকটি অন্ধকারে ছিলেন; যথা রাত্রির অন্ধকার, সমুদ্রের পানির অন্ধকার ও মাছের পেটের অন্ধকার।

2 আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া | Tafsir Abu Bakr Zakaria

আর স্মরণ করুন, যুন-নূনকে [১], যখন তিনি ক্রোধ ভরে [২] চলে গিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন যে, আমরা তাকে পাকড়াও করব না [৩]। তারপর তিনি অন্ধকারে [৪] এ আহবান করেছিলেন যে , আপনি ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই; আপনি কতইনা পবিত্র ও মহান, নিশ্চয়ই আমি যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি [৫]।

[১] ইউনুস ইবনে মাত্তা আলাইহিস সালাম এর কাহিনী পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুস, সূরা আল-আম্বিয়া, সূরা আস-সাফফাত ও সূরা আল-কালামে বিবৃত হয়েছে। কোথাও তার আসল নাম উল্লেখ করা হয়েছে, কোথাও যুননুন এবং কোথাও ছাহেবুল হূত উল্লেখ করা হয়েছে। নূন ও হূত উভয় শব্দের অর্থ মাছ। কাজেই যুন নুন ও সাহেবুল হূতের অর্থ মাছওয়ালা। ইউনুস আলাইহিস সালামকে কিছুদিন মাছের পেটে অবস্থান করতে হয়েছিল এই আশ্চর্য ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে যুন-নুন বা ছাহেবুল হূত শব্দদ্বয়ের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে।

বিভিন্ন তাফসীরে এসেছে যে, ইউনুস আলাইহিস সালামকে মুসেলের একটি জনপদ নায়নুয়ার অধিবাসীদের হেদায়াতের জন্যে প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি তাদেরকে ঈমান ও সৎকর্ম করার দাওয়াত দেন। তারা অবাধ্যতা প্ৰদৰ্শন করে। ইউনুস আলাইহিস সালাম তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে আযাবের ভয় দেখিয়ে জনপদ ত্যাগ করেন। এতে তারা ভাবতে থাকে যে এখন আযাব এসেই যাবে। (কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে আযাবের কিছু কিছু চিহ্নও ফুটে উঠেছিল) তাই অনতিবিলম্বে তারা শির্ক ও কুফর থেকে তওবা করে নেয় এবং জনপদের সব আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা জঙ্গলের দিকে চলে যায়। তারা চতুষ্পদ জন্তু ও বাচ্চাদেরকেও সাথে নিয়ে যায় এবং বাচ্চাদেরকে তাদের মায়েদের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়। এরপর সবাই কান্নাকাটি শুরু করে এবং কাকুতি-মিনতি সহকারে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকে। জন্তুদের বাচ্চারা মা দের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়ার কারণে পৃথক শোরগোল করতে থাকে। আল্লাহ্ তা'আলা তাদের খাটি তাওবা ও কাকুতি-মিনতি কবুল করে নেন এবং তাদের উপর থেকে আযাব হটিয়ে দেন। এদিকে ইউনুস আলাইহিস সালাম ভাবছিলেন যে, আযাব আসার ফলে তার সম্পপ্রদায় বোধ হয় ধ্বংস হয়ে গেছে । কিন্তু পরে যখন জানতে পারলেন যে, আদৌ আযাব আসেনি এবং তার সম্প্রদায় সুস্থ ও নিরাপদে দিন গুজরান করছে, তখন তিনি চিন্তান্বিত হলেন যে, এখন আমাকে মিথ্যাবাদী মনে করা হবে। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, তার সম্প্রদায়ের মধ্যে কেউ মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে হত্যা করার প্রথা প্রচলিত ছিল। এর ফলে ইউনুস আলাইহিস সালাম -এর প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দিল। তিনি সম্পপ্রদায়ের মধ্যে ফিরে আসার পরিবর্তে ভিনদেশে হিজরত করার ইচ্ছায় সফর শুরু করলেন। পথিমধ্যে একটি নদী পড়ল। তিনি একটি নৌকায় আরোহন করলেন। ঘটনাক্রমে নৌকা আটকে গিয়ে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হল। মাঝিরা বলল যে, আরোহীদের মধ্যে একজনকে নদীতে ফেলে দিতে হবে। তাহলে অন্যরা ডুবে মরার কবল থেকে রক্ষা পাবে। এখন কাকে ফেলা হবে, এ নিয়ে আরোহীদের নামে লটারী করা হলে ঘটনাক্রমে এখানে ইউনুস আলাইহিস সালাম এর নাম বের হল। এই লটারীর কথা উল্লেখ প্রসঙ্গে কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে “লটারীর ব্যবস্থা করা হলে তার (ইউনুস আলাইহিস সালাম এর) নামই তাতে বের হয়।” [সূরা আস-সাফফাতঃ ১৪১] তখন ইউনুস আলাইহিস সালাম দাঁড়িয়ে গেলেন এবং অনাবশ্যক কাপড় খুলে নদীতে ঝাপিয়ে পড়লেন। এদিকে আল্লাহ তা'আলা সবুজ সাগরে এক মাছকে আদেশ দিলে সে সাগরের পানি চিরে দ্রুতগতিতে সেখানে পৌছে যায় (ইবনে মাসউদের উক্তি) এবং ইউনুস আলাইহিস সালাম -কে উদরে পুরে নেয়। আল্লাহ তা'আলা মাছকে নির্দেশ দেন যে, ইউনুস আলাইহিস সালাম এর অস্থি-মাংসের যেন কোন ক্ষতি না হয় সে তার খাদ্য নয়, বরং তার উদর কয়েকদিনের জন্যে তার কয়েদখানা। [ইবন কাসীর] কুরআনের বক্তব্য ও অন্যান্য বর্ণনা থেকে এতটুকু জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলার পরিষ্কার নির্দেশ ছাড়াই ইউনুস আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। তার এই কার্যক্রম আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। ফলে তিনি অসন্তোষের কারণ হন এবং তাকে সমুদ্রে মাছের পেটে অবস্থান করতে হয়।

[২] অর্থাৎ ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেলেন। বাহ্যতঃ এখানে সম্পপ্রদায়ের প্রতি ক্ৰোধ বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পালনকর্তার খাতিরে ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেলেন। কাফের ও পাপাচারীদের প্রতি আল্লাহর খাতিরে রাগাম্বিত হওয়া সাক্ষাত ঈমানের আলামত। [ফাতহুল কাদীর] অন্য অর্থ হচ্ছে, তিনি জাতির উপর রাগ করে চলে গেলেন। [ফাতহুল কাদীর]

[৩] অভিধানের দিক দিয়ে نقدر শব্দের তিন রকম অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রথম, কাবু করা। অর্থাৎ তিনি ধারণা করলেন যে, আমি তাকে কাবু করতে পারব না। বলাবাহুল্য, এরূপ ধারণা কোন নবী তো দূরের কথা সাধারণ মুসলিমও করতে পারে না। কারণ, এরূপ মনে করা প্রকাশ্য কুফর। [ফাতহুল কাদীর] কাজেই আয়াতে এই অর্থ হওয়া মোটেই সম্ভবপর নয়। দ্বিতীয় অর্থ, সংকীর্ণ করা; যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ

اللّٰهُ يَبْسُطُالرِّزْقَ لِمَنْ يَّشَآءُوَيَقْرِدُ

“আল্লাহ যার জন্যে জীবিকা প্রশস্ত করে দেন এবং যার জন্যে ইচ্ছা সংকীর্ণ করে দেন।” [সূরা আর-রা'দঃ ২৬], অনুরূপ আয়াত আরও [দেখুন, সূরা আল-ইসরাঃ ৩০, সূরা আল-কাসাসঃ ৮২, সূরা আল-আনকাবৃতঃ ৬২, সূরা আর-রূমঃ ৩৭, সূরা সাবাঃ ৩৬, সূরা আয-যুমারঃ ৫২, সূরা আশ-শূরাঃ ১২] যেখানে সর্বসম্মতভাবে অর্থ হচ্ছেঃ সংকীর্ণ করা। তখন আয়াতের অর্থ হবে, ইউনুস আলাইহিস সালাম মনে করলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সম্প্রদায়কে ছেড়ে কোথাও চলে যাওয়ার ব্যাপারে আমার প্রতি কোনরূপ সংকীর্ণ আচরণ করা হবে না। [ফাতহুল কাদীর] তৃতীয় অর্থ, বিচারে রায় দেয়া। তখন আয়াতের অর্থ হবে এই যে, ইউনুস আলাইহিস সালাম মনে করলেন, এ ব্যাপারে আমার কোন ত্রুটি ধরা হবে না। তাই আমাকে পাকড়াও করা হবে না। [ইবন কাসীর] মোটকথা, প্রথম অর্থের সম্ভাবনাই নেই, দ্বিতীয় অথবা, তৃতীয় অর্থ সম্ভবপর।

[৪] অর্থাৎ মাছের পেটের মধ্য থেকে সেখানে তো অন্ধকার ছিলই, তার উপর ছিল সাগরের অন্ধকার ও রাতের অন্ধকার। [ইবন কাসীর] অথবা মাছের পেটের অন্ধকার, সে মাছের পেট থেকে অপর মাছের পেটের অন্ধকার তার উপর রয়েছে সমুদ্রের অন্ধকার। [ইবন কাসীর] ইবন মাসউদ ও ইবন আব্বাস বলেন, তাকে নিয়ে মাছটি সমুদ্রের গভীরে চলে গেলে সেখানে ইউনুস আলাইহিস সালাম পাথরের তাসবীহ শুনতে পেয়ে তাসবীহ পড়ার কথা স্মরণ করলেন। এবং তিনি সেই দোআটি করলেন। [ইবন কাসীর]

[৫] ইউনুস আলাইহিস সালামের দোআ প্রত্যেকের জন্যে, প্রতি যুগের ও প্রতি মকসুদের জন্যে মকবুল। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “মাছের পেটে পাঠকৃত ইউনুস আলাইহিস সালাম এর এই দোআটি যদি কোন মুসলিম কোন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে পাঠ করে, তবে আল্লাহ্ তা'আলা তা কবুল করেন। ” [তিরমিযীঃ ৩৫০৫]

3 আল-বায়ান ফাউন্ডেশন | Tafsir Bayaan Foundation

আর স্মরণ কর যুন-নূন এর কথা, যখন সে রাগান্বিত অবস্থায় চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল যে, আমি তার উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। তারপর সে অন্ধকার থেকে ডেকে বলেছিল, ‘আপনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই’। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম যালিম’ ।

4 মুহিউদ্দীন খান | Muhiuddin Khan

এবং মাছওয়ালার কথা স্মরণ করুন তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন, অতঃপর মনে করেছিলেন যে, আমি তাঁকে ধৃত করতে পারব না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহবান করলেনঃ তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই; তুমি নির্দোষ আমি গুনাহগার।

5 জহুরুল হক | Zohurul Hoque

আর যুন-নূন, -- স্মরণ করো, তিনি চলে গিয়েছিলেন রেগেমেগে, আর তিনি ভেবেছিলেন যে আমরা কখনো তাঁর উপরে ক্ষমতা চালাব না, তখন সেই সংকটে তিনি আহ্বান করলেন যে ''তুমি ছাড়া অন্য উপাস্য নেই, তোমারই সব মহিমা, আমি নিশ্চয়ই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি।’’