Skip to main content

সূরা আন-নূর শ্লোক 31

وَقُل
এবং বলো
لِّلْمُؤْمِنَٰتِ
মু'মিন নারীদেরকে
يَغْضُضْنَ
তারা সংযত রাখে (যেন)
مِنْ
ব্যাপার
أَبْصَٰرِهِنَّ
তাদের দৃষ্টিসমূহের
وَيَحْفَظْنَ
ও সংরক্ষণ করে (যেন)
فُرُوجَهُنَّ
তাদের লজ্জাস্থানসমূহকে
وَلَا
এবং না (যেন)
يُبْدِينَ
প্রদর্শন করে
زِينَتَهُنَّ
তাদের সৌন্দর্য
إِلَّا
ছাড়া
مَا
যা
ظَهَرَ
(সাধারণভাবে) প্রকাশ পায়
مِنْهَاۖ
তা হ'তে
وَلْيَضْرِبْنَ
এবং জড়িয়ে রাখে যেন
بِخُمُرِهِنَّ
দিয়ে তাদের ওড়না
عَلَىٰ
উপর
جُيُوبِهِنَّۖ
তাদের ঘাড় ও বুকের
وَلَا
আর না (যেন)
يُبْدِينَ
প্রকাশ করে
زِينَتَهُنَّ
তাদের সৌন্দর্য
إِلَّا
ছাড়া
لِبُعُولَتِهِنَّ
নিকট তাদের স্বামীদের
أَوْ
অথবা
ءَابَآئِهِنَّ
তাদের পিতাদের (নিকট)
أَوْ
অথবা
ءَابَآءِ
(নিকট) পিতাদের
بُعُولَتِهِنَّ
তাদের স্বামীদের
أَوْ
অথবা
أَبْنَآئِهِنَّ
তাদের পুত্রদের (নিকট)
أَوْ
অথবা
أَبْنَآءِ
(নিকট) পুত্রদের
بُعُولَتِهِنَّ
তাদের স্বামীদের
أَوْ
অথবা
إِخْوَٰنِهِنَّ
তাদের ভাইদের (নিকট)
أَوْ
অথবা
بَنِىٓ
(নিকট) পুত্রদের
إِخْوَٰنِهِنَّ
তাদের ভাইদের
أَوْ
অথবা
بَنِىٓ
(নিকট) পুত্রদের
أَخَوَٰتِهِنَّ
তাদের বোনদের
أَوْ
অথবা
نِسَآئِهِنَّ
তাদের স্ত্রীলোকদের (মিলামিশার)
أَوْ
অথবা
مَا
যা
مَلَكَتْ
মালিক হয়েছে
أَيْمَٰنُهُنَّ
তাদের ডান হাত (অর্থাৎ দাসী)
أَوِ
অথবা
ٱلتَّٰبِعِينَ
অধীনস্থ পুরুষরা (এমন)
غَيْرِ
নয় (যারা)
أُو۟لِى
সম্পন্ন
ٱلْإِرْبَةِ
যৌন কামনা
مِنَ
মধ্য হ'তে
ٱلرِّجَالِ
পুরুষদের
أَوِ
অথবা
ٱلطِّفْلِ
বালক
ٱلَّذِينَ
যারা
لَمْ
নি হয়
يَظْهَرُوا۟
অবহিত
عَلَىٰ
সম্পর্কে
عَوْرَٰتِ
গোপন অঙ্গ
ٱلنِّسَآءِۖ
স্ত্রীলোকদের
وَلَا
আর না
يَضْرِبْنَ
তারা মারবে
بِأَرْجُلِهِنَّ
দিয়ে তাদের পাগুলোকে (অর্থাৎ চলাফেরা করবে)
لِيُعْلَمَ
(এমনভাবে) যেন কেউ জানতে পারে
مَا
যা
يُخْفِينَ
তারা গোপন রেখেছে
مِن
থেকে
زِينَتِهِنَّۚ
তাদের সৌন্দর্য
وَتُوبُوٓا۟
আর তোমরা তওবা করো
إِلَى
নিকট
ٱللَّهِ
আল্লাহ্‌র
جَمِيعًا
সকলেই
أَيُّهَ
হে
ٱلْمُؤْمِنُونَ
মু'মিনরা
لَعَلَّكُمْ
আশা করা যায় তোমরা
تُفْلِحُونَ
কল্যাণ পাবে

তাফসীর তাইসীরুল কুরআন:

আর ঈমানদার নারীদেরকে বলে দাও তাদের দৃষ্টি অবনমিত করতে আর তাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করতে, আর তাদের শোভা সৌন্দর্য প্রকাশ না করতে যা এমনিতেই প্রকাশিত হয় তা ব্যতীত। তাদের ঘাড় ও বুক যেন মাথার কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাই-এর ছেলে, বোনের ছেলে, নিজেদের মহিলাগণ, স্বীয় মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনামুক্ত পুরুষ আর নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া অন্যের কাছে নিজেদের শোভা সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজেদের গোপন শোভা সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবাহ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।

1 আহসানুল বায়ান | Tafsir Ahsanul Bayaan

বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে।[১] তারা যা সাধারণতঃ প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত[২] তাদের সৌন্দর্য যেন প্রদর্শন না করে[৩] তারা তাদের বক্ষঃস্থল যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত রাখে।[৪] তারা যেন[৫] তাদের স্বামী,[৬] পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগিনী পুত্র,[৭] তাদের নারীগণ, [৮] নিজ অধিকারভুক্ত দাস,[৯] যৌনকামনা-রহিত পুরুষ[১০] অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক[১১] ব্যতীত কারও নিকট তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন এমন সজোরে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন আভরণ প্রকাশ পেয়ে যায়।[১২] হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। [১৩]

[১] যদিও মহিলারা দৃষ্টি সংযত রাখা ও গুপ্তাঙ্গের হিফাযত করার প্রথম আদেশেই শামিল, যা ব্যাপকভাবে সকল মু'মিনদেরকে দেওয়া হয়েছে; যেহেতু মু'মিন মহিলারাও ব্যাপকার্থে মু'মিনদেরই অন্তর্ভুক্ত। তবুও এখানে বিষয়টির গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিশেষভাবে মহিলাদেরকেও দ্বিতীয়বার সেই একই আদেশ দেওয়া হচ্ছে। যার উদ্দেশ্য হল তাকীদ ও গুরুত্ব আরোপ। এখান হতে কিছু উলামাগণ দলীল গ্রহণ করে বলেছেন যে, যেরূপ পুরুষদের জন্য বেগানা মহিলাদেরকে তাকিয়ে দেখা নিষিদ্ধ, অনুরূপ মহিলাদের জন্যও বেগানা পুরুষদেরকে তাকিয়ে দেখা ব্যাপকভাবে নিষিদ্ধ। পক্ষান্তরে অন্য কিছু উলামা সেই হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ করে মহিলাদের জন্য পুরুষদেরকে নিষ্কাম দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখা বৈধ বলেছেন, যে হাদীসে আয়েশা (রাঃ)-এর হাবশীদের খেলা দেখার বর্ণনা রয়েছে।

(বুখারীঃ নামায অধ্যায়)



[২] 'যা সাধারণতঃ প্রকাশ থাকে' বলতে এমন সৌন্দর্য (বাহ্যিক আভরণ) বা দেহের অংশকে বুঝানো হয়েছে যা পর্দা বা গোপন করা অসম্ভব। যেমন কোন জিনিস নিতে বা দিতে গিয়ে হাতের করতল, অথবা কিছু দেখতে গিয়ে চোখ গোপন করা সহজ নয়। অনুরূপভাবে হাতের মেহেন্দী, আঙ্গুলের আংটি, চোখের সুর্মা, কাজল, অথবা পরিহিত সৌন্দর্যময় পোশাককে ঢাকার জন্য যে বোরকা বা চাদর ব্যবহার করা হয়, তাও এক প্রকার সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত; যা গোপন করা অসম্ভব। অতএব এই সব আভরণের প্রকাশ প্রয়োজন মত দরকার সময়ে বৈধ।

[৩] সৌন্দর্য বলতে এমন পোশাক ও অলংকার বোঝায় যা মহিলারা নিজেদের রূপ-সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করে থাকে। যে সৌন্দর্য একমাত্র স্বামীদের জন্য ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং নারীর পোশাক ও অলংকারের সৌন্দর্য প্রকাশ যদি অন্য পুরুষের সামনে নিষিদ্ধ হয়, তাহলে দেহের কোন অংশ খুলে প্রদর্শন করা ইসলামে কেমন করে অনুমতি থাকতে পারে? এ তো অধিকরূপে হারাম তথা নিষিদ্ধ হবে।

[৪] যাতে মাথা ঘাড়, গলা ও বুকের পর্দা হয়ে যায়। কারণ এ সমস্ত অঙ্গ খুলে রাখার অনুমতি নেই।

[৫] এখানে সেই সৌন্দর্য বা প্রসাধন এগানা পুরুষদের সামনে প্রকাশ করা বৈধ বলা হচ্ছে, যা ইতিপূর্বে বেগানা পুরুষদের সামনে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। অর্থাৎ, পোশাক, অলংকার ও প্রসাধন ইত্যাদির সৌন্দর্য যা চাদর বা বোরকার নিচে গুপ্ত থাকে। এখানে এ মর্মে ব্যতিক্রমধর্মী বর্ণনা এসেছে যে, অমুক অমুক ব্যক্তির সামনে প্রকাশ করা বৈধ হবে।

[৬] এদের মধ্যে সবার শীর্ষে হল স্বামী। সেই জন্য স্বামীকে সবার আগে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ স্ত্রীর সকল শোভা- সৌন্দর্য একমাত্র স্বামীর জন্যই নির্দিষ্ট। আর স্বামীর জন্য স্ত্রীর সারা দেহ (দেখা ও ছোঁয়া) বৈধ। (যেহেতু স্বামী-স্ত্রী একে অপরের লেবাস।) এ ছাড়া মাহরাম (এগানা; যাদের সঙ্গে চিরতরে বিবাহ হারাম) অথবা ঘরে যাদের আসা-যাওয়া সব সময় হয়ে থাকে এবং নৈকট্য বা আত্মীয়তার কারণে বা অন্য কোন প্রাকৃতিক কারণে নারীর প্রতি তাদের সকাম এমন আকর্ষণ সৃষ্টি হয় না, যার ফলে কোন ফিতনা (বা অঘটন) ঘটার আশঙ্কা থাকে, শরীয়তে সেই সমস্ত লোকদের সামনে এবং এগানা পুরুষদের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে মামা ও চাচার কথা উল্লেখ হয়নি। অধিকাংশ উলামাগণের নিকট এরাও মাহরাম বা এগানার অন্তর্ভুক্ত। এদের সামনেও সৌন্দর্য প্রদর্শন মহিলার জন্য বৈধ। পক্ষান্তরে কিছু উলামার নিকট এরা মাহরামের অন্তর্ভুক্ত নয়। (ফাতহুল কাদীর)

[৭] পিতা বলতে বাপ, দাদা, দাদার বাপ এবং তার ঊর্ধ্বে, নানা ও নানার বাপ এবং তার ঊর্ধ্বের সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ শ্বশুর বলতে শ্বশুরের বাপ, দাদা এবং তার ঊর্ধ্বে সকলেই শামিল। পুত্র বলতে বেটা, পোতা, পোতার বেটা, নাতী নাতীর বেটা এবং এদের নিম্নের সকলেই শামিল। স্বামীর পুত্র বলতেও তার (অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত) বেটা, পোতা এবং তার নিম্নের সকলেই শামিল। ভ্রাতা বলতে সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় তিন প্রকারের ভাইকেই বুঝানো হয়েছে। ভ্রাতুষ্পুত্র বলতে ভাইপো বা ভাতিজা ও তাদের নিম্নের সকল পুরুষকে এবং ভগিনী পুত্র বলতে সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় তিন প্রকার বোনের বেটা (ভাগ্নে) ও তাদের নিম্নের সকল পুরুষকে বুঝানো হয়েছে।

[৮] 'তাদের নারীগণ' বলতে মুসলিম মহিলাদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে যে, তারা যেন কোন মহিলার শোভা-সৌন্দর্য, রূপ-লাবণ্য, দৈহিক আকার-আকৃতি নিজেদের স্বামীর কাছে বর্ণনা না করে। এ ছাড়া যে কোন কাফের মহিলার সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করা নিষেধ। এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন উমার, আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ), মুজাহিদ এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রঃ)। কেউ কেউ বলেন, এখানে 'তাদের নারীগণ' বলতে বিশেষ ধরনের নারীদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা খিদমত ইত্যাদির জন্য সর্বদা কাছে থাকে, আর তার মধ্যে বাঁদী-দাসীও শামিল। (এদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করায় দোষ নেই।)

[৯] مَا ملَكَتْ أِيمَانُهُنَّ (তাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে) বলতে কেউ কেউ শুধু ক্রীতদাসী এবং কেউ কেউ শুধুমাত্র ক্রীতদাস অর্থ নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ উভয়কেই বুঝিয়েছেন। হাদীসেও পরিষ্কার এসেছে যে, ক্রীতদাসদের সামনে পর্দার প্রয়োজন নেই। (আবু দাউদঃ পরিচ্ছদ অধ্যায়) অনুরূপভাবে কেউ কেউ তার ব্যাপক অর্থ নিয়ে বলেছেন, তাতে মু'মিন ও কাফের উভয় প্রকার ক্রীতদাস শামিল।

[১০] কেউ কেউ এ থেকে এমন সব পুরুষ অর্থ নিয়েছেন, যাদের ঘরে থেকে খাওয়া-পান করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকে না। আবার কেউ নির্বোধ, কেউ হিজড়া, খাসি করা বা ধ্বজভঙ্গ, কেউ অতিবৃদ্ধ অর্থ নিয়েছেন। ইমাম শাওকানী (রঃ) বলেন, যাদের মধ্যে কুরআনে বর্ণিত গুণ পাওয়া যাবে, তারা এর পর্যায়ভুক্ত এবং অন্যেরা বহির্ভূত হবে।

[১১] এ থেকে এমন সব বালককে বুঝানো হয়েছে যারা সাবালক বা সাবালকত্বের নিকটবর্তী নয়। কারণ এরা মেয়েদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অভিজ্ঞ নয়।

[১২] গোপন আভরণ বা অলঙ্কার প্রকাশ পেয়ে অর্থাৎ, পায়ের নূপুরের শব্দে পুরুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট না হয়। হাই-হিল বা এমন শক্ত জুতা-চপ্পলও এই নির্দেশের শামিল। যেহেতু মহিলারা যখন এসব পরিধান করে চলা-ফিরা করে, তখন তাতে এক ধরনের এমন শব্দ সৃষ্টি হয়, যা আকর্ষণে নূপুরের শব্দের তুলনায় কম নয়। অনুরূপ হাদীসে এসেছে যে, সুগন্ধি মেখে ঘর থেকে বের হওয়া মহিলার জন্য বৈধ নয়। যে এ রকম করে, সে ব্যভিচারিণী। (তিরমিযীঃ অনুমতি অধ্যায়, আবু দাউদঃ চুল আঁচড়ানো অধ্যায়।)

[১৩] এখানে পর্দার আদেশের পরপর তওবার আদেশ দেওয়ার মধ্যে যুক্তি হল যে, অজ্ঞতার যুগে এই সমস্ত আদেশের যে বিরোধিতা তোমরা করতে তা যেহেতু ইসলাম আসার পূর্বের কথা, সেহেতু তোমরা যদি সত্য অন্তরে তওবা করে নাও এবং উক্ত আদেশের সঠিক বাস্তবায়ন কর, তাহলে সফলতা, ইহ ও পরকালের সৌভাগ্য একমাত্র তোমাদের।

2 আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া | Tafsir Abu Bakr Zakaria

আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে [১] এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে [২]; আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য [৩] প্রদর্শন না করে তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে [৪]। আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে [৫]। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীরা [৬], তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা- রহিত পুরুষ [৭] এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক [৮] ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদচারণা না করে [৯]। হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্‌র দিকে ফিরে আস [১০], যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’

[১] এ দীর্ঘ আয়াতের সূচনাভাগে সেই বিধানই বর্ণিত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী আয়াতে পুরুষদের জন্য ব্যক্ত হয়েছে। অর্থাৎ তারা যেন দৃষ্টি নত রাখে তথা দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। পুরুষদের বিধানে নারীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু জোর দেয়ার জন্য তাদের কথা পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর] অনেক আলেমের মতেঃ নারীদের জন্য মাহরাম নয়, এমন পুরুষের প্রতি দেখা সর্বাবস্থায় হারাম; কামভাব সহকারে বদ নিয়তে দেখুক অথবা এ ছাড়াই দেখুক। [ইবন কাসীর] তার প্রমাণ উম্মে সালমা বর্ণিত হাদীস যাতে বলা হয়েছেঃ ‘একদিন উম্মে-সালমা ও মায়মুনা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা উভয়েই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলেন। হঠাৎ অন্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম তথায় আগমন করলেন। এই ঘটনার সময়-কাল ছিল পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার পর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উভয়কে পর্দা করতে আদেশ করলেন। উম্মে-সালমা বললেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসূল, সে তো অন্ধ, সে আমাদেরকে দেখতে পাবে না এবং আমাদেরকে চেনেও না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা তো অন্ধ নও, তোমরা তাকে দেখছ। [তিরমিযীঃ ২৭৭৮, আবু দাউদঃ ৪১১২] তবে হাদীসটির সনদ দূর্বল। অপর কয়েকজন ফেকাহবিদ বলেনঃ কামভাব ব্যতীত বেগানা পুরুষকে দেখা নারীর জন্য দোষনীয় নয়। তাদের প্রমাণ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার হাদীস, যাতে বলা হয়েছেঃ একবার ঈদের দিন মসজিদে নববীর আঙ্গিনায় কিছু সংখ্যক হাবশী যুবক সামরিক কুচকাওয়াজ করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কুচকাওয়াজ নিরিক্ষণ করতে থাকেন এবং তার আড়ালে দাঁড়িয়ে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাও এই কুচকাওয়াজ উপভোগ করতে থাকেন এবং নিজে অতিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত দেখে যান। [বুখারীঃ ৪৫৫, মুসলিমঃ ৭৯২]

[২] অর্থাৎ তারা যেন অবৈধ যৌন উপভোগ থেকে দূরে থাকে এবং নিজের সতর অন্যের সামনে উন্মুক্ত করাও পরিহার করে। [তাবারী, ইবন কাসীর] হাদীসে এসেছে, “মহিলা হলো আওরত তথা গোপণীয় বিষয়” [তিরমিযীঃ ১১৭৩, সহীহ ইবনে হিব্বানঃ ৫৫৯৯, সহীহ ইবনে খুযাইমাহঃ ১৬৮৫] পুরুষদের জন্য মেয়েদের সতর তার সারা শরীর। স্বামী ছাড়া অন্য কোন-পুরুষ এমন কি বাপ ও ভাইয়ের সামনেও তা খোলা উচিত নয়। মেয়েদের এমন পাতলা বা চোস্ত পোশাক পরা উচিত নয় যার মধ্য দিয়ে শরীর দেখা যায় বা শরীরের গঠন কাঠামো ভেতর থেকে ফুটে উঠতে থাকে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বৰ্ণনা করেন, তার বোন আসমা বিনতে আবু বকর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে আসেন। তখন তিনি পাতলা কাপড় পরে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংগে সংগেই মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বলেনঃ ‘‘হে আসমা! কোন মেয়ে যখন বালেগ হয়ে যায় তখন তার এটা ও ওটা ছাড়া শরীরের কোন অংশ দেখা যাওয়া জায়েয নয়।” বর্ণনাকারী বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতের কব্জি ও চেহারার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। [আবু দাউদঃ ৪১০৪]

[৩] আয়াতের অর্থ এই যে, মুহরিম ব্যতিত সাজ-সজ্জার স্থানসমূহ প্রকাশ না করা মহিলাদের উপর ওয়াজিব। [তাবারী, বাগভী]

[৪] আয়াতে পর্দার বিধানের কয়েকটি ব্যতিক্রম আলোচনা করা হচ্ছে। প্রথম ব্যতিক্রম হচ্ছে مَاظَهَرَمِنْهَا অর্থাৎ নারীর কোন সাজ-সজ্জার অঙ্গ পুরুষের সামনে প্রকাশ করা বৈধ নয়, অবশ্য সেসব অঙ্গ ব্যতীত, যেগুলো আপনা-আপনি প্ৰকাশ হয়ে পড়ে অর্থাৎ কাজকর্ম ও চলাফেরার সময় সেসব অঙ্গ স্বভাবতঃ খুলেই যায়। এগুলো ব্যতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো প্ৰকাশ করার মধ্যে কোন গোনাহ নেই। এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমের তাফসীর দু’ধরনের। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেনঃ مَاظَهَرَمِنْهَا বাক্যে উপরের কাপড়; যেমন বোরকা, লম্বা চাদর ইত্যাদিকে ব্যতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো সাজ-সজ্জার পোশাককে আবৃত রাখার জন্য পরিধান করা হয়। আয়াতের অর্থ এই যে, প্রয়োজনবশতঃ বাইরে যাওয়ার সময় যেসব উপরের কাপড় আবৃত করা সম্ভবপর নয়, সেগুলো ব্যতীত সাজ-সজ্জার কোন বস্তু প্ৰকাশ করা জায়েয নয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাও বলেনঃ এখানে প্রকাশ্য সৌন্দর্য বলতে চেহারা, চোখের সুরমা, হাতের মেহেদী বা রঙ এবং আংটি। সুতরাং এগুলো সে তার ঘরে যে সমস্ত মানুষ তার কাছে প্ৰবেশ করার অনুমতি আছে, তাদের সামনে প্ৰকাশ করবে।

কোন কোন মুফাসসির এ আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ নারীর আসল বিধান এই যে, সে তার সাজ-সজ্জার কোন কিছুই প্ৰকাশ করবে না। আয়াতের উদ্দেশ্যও তাই। তবে চলাফেরা ও কাজকর্মে স্বভাবতঃ যেগুলো খুলে যায়, সেগুলো অপারগতার কারণে গোনাহ থেকে মুক্ত। নারী কোন প্রয়োজনে বাইরে বের হলে বোরকা, চাদর ইত্যাদি প্রকাশ হয়ে পড়া সুনির্দিষ্ট। লেন-দেনের প্রয়োজনে কোন সময় মুখমণ্ডল ও হাতের তালুও প্রকাশ হয়ে পড়ে। এটাও ক্ষমার্হ- গোনাহ নয়। পক্ষান্তরে কোন কোন মুফাসসির اِلَّامَاظَهَرَمِنْهَا এর অর্থ নিয়েছেনঃ “মানুষ স্বাভাবিকভাবে যা প্ৰকাশ করে দেয়” এবং তারপর তারা এর মধ্যে শামিল করে দিয়েছেন মুখ ও হাতকে তাদের সমস্ত সাজসজ্জাসহ। [দেখুন-তাবারী, ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর, সহীহ আল-মাসবুর]

[৫] অর্থাৎ তারা যেন বক্ষদেশে ওড়না ফেলে রাখে। خُمُر শব্দটি خمار এর বহুবচন। অর্থ ঐ কাপড়, যা নারী মাথায় ব্যবহার করে এবং তা দ্বারা গলা ও বক্ষ আবৃত হয়ে যায়। خيوب শব্দটি خيب এর বহুবচন- এর অর্থ জামার কলার। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর] জাহেলী যুগে মহিলারা মাথায় এক ধরনের আঁটসাঁট বাঁধন দিতো। মাথার পেছনে চুলের খোঁপার সাথে এর গিরো বাঁধা থাকতো। সামনের দিকে বুকের একটি অংশ খোলা থাকতো। সেখানে গলা ও বুকের উপরের দিকের অংশটি পরিষ্কার দেখা যেতো। বুকে জামা ছাড়া আর কিছুই থাকতো না। পেছনের দিকে দুটো তিনটে খোঁপা দেখা যেতো। তাই মুসলিম নারীদেরকে আদেশ করা হয়েছে তারা যেন এরূপ না করে; বরং ওড়নার উভয় প্রান্ত পরস্পর উল্টিয়ে রাখে, এতে করে যেন সকল অঙ্গ আবৃত হয়ে পড়ে। [ইবন কাসীর] আয়াত নাযিল হবার পর মুসলিম মহিলাদের মধ্যে ওড়নার প্রচলন করা হয়। মু’মিন মহিলারা কুরআনের এ হুকুমটি শোনার সাথে সাথে যেভাবে একে কার্যকর করে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা তার প্রশংসা করে বলেনঃ সূরা নূর নাযিল হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে

وَلْيَضْرِبْنَ جِخُمُرِهِنَّ عَلىٰ جُيُوْبِهِنَّ

বাক্যাংশ শোনার পর তারা নিজের কোমরে বাঁধা কাপড় খুলে নিয়ে আবার অনেকে চাদর তুলে নিয়ে সংগে সংগেই ওড়না বানিয়ে ফেলল এবং তা দিয়ে শরীর ঢেকে ফেললো। [বুখারীঃ ৪৭৫৯] অন্য বর্ণনায় এসেছে, উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, যখন

وَلْيَضْرِبْنَ جِخُمُرِهِنَّ عَلىٰ جُيُوْبِهِنَّ

এ আয়াত নাযিল হলো, তখন তাদের মাথা এমনভাবে কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেলল মনে হয় যেন তাদের মাথার উপর কাক রয়েছে। [আবু দাউদঃ ৪১০১] এ সম্পর্কিত অন্য একটি হাদীসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা আরো বিস্তারিত বর্ণনা করে বলেনঃ আল্লাহ্‌ প্রথম যুগের মুহাজির মহিলাদের উপর রহমত নাযিল করুন তারা

وَلْيَضْرِبْنَ جِخُمُرِهِنَّ عَلىٰ جُيُوْبِهِنَّ

নাযিল হওয়ার পরে পাতলা কাপড় পরিত্যাগ করে নিজেদের মোটা কাপড় বাছাই করে তা দিয়ে ওড়না তৈরী করে। [আবু দাউদঃ ৪১০২]

[৬] পর্দার বিধান থেকে পরবর্তী ব্যতিক্রম হলো আল্লাহ্‌র বাণীঃ اَوْنِسَآىِٕهِنَّ অর্থাৎ নিজেদের স্ত্রীলোক; এর উদ্দেশ্য মুসলিম স্ত্রীলোক। তাদের সামনেও এমনসব অঙ্গ খোলা যায়, যেগুলো নিজ পিতা ও পুত্রের সামনে খোলা যায়। [ইবন কাসীর]

তবে আয়াতে ‘তাদের নিজেদের স্ত্রীলোক’ বলা থেকে জানা গেল যে, কাফের মুশরিক স্ত্রীলোকরা পর্দার হুকুমের ব্যতিক্রম নয়। তাদের সাথে পর্দা করা প্রয়োজন। তারা বেগানা পুরুষদের বিধানের অন্তর্ভুক্ত। এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে ইবনে কাসীর মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেনঃ এ থেকে জানা গেল যে, কাফের নারীদের সামনে অঙ্গ প্রকাশ করা কোন মুসলিম নারীর জন্য জায়েয নয়। কিন্তু সহীহ হাদীসসমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের সামনে কাফের নারীদের যাতায়াত প্রমাণিত আছে। তাই এ প্রশ্নে মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে মতভেদ বিদ্যমান। কারো মতে কাফের নারী বেগানা পুরুষদের মত। কেউ কেউ এ ব্যাপারে মুসলিম ও কাফের উভয় প্রকার নারীর একই বিধান রেখেছেন; অর্থাৎ তাদের কাছে পর্দা করতে হবে না । [দেখুন-বাগভী, ফাতহুল কাদীর]

(৭) একাদশ প্রকার

اَوِالتّٰبِعِيْنَ عَيْرِاوُلىِ الْاِرْبَةِمِنَ الرِّجِالِ

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেনঃ এখানে এমন নির্বোধ ও ইন্দ্রিয়বিকল ধরনের লোকদের বুঝানো হয়েছে, যাদের নারী জাতির প্রতি কোন আগ্রহ ও ঔৎসুক্যই নেই। ইবনে জরীর তাবারী একই বিষয়বস্তুই আবু আব্দুল্লাহ, ইবনে জুবায়র, ইবনে আতিয়্যা প্রমুখ থেকে বর্ণনা করেছেন। কাজেই আয়াতে এমনসব পুরুষকে বুঝানো হয়েছে, যাদের মধ্যে নারীদের প্রতি কোন আগ্রহ ও কামভাব নেই এবং নারীদের রূপ-গুণের প্রতিও তাদের কোন ঔৎসুক্য নেই যে, অপরের কাছে গিয়ে বর্ণনা করবে।
তবে নপুংসক ধরনের লোক যারা নারীদের বিশেষ গুণাবলীর সাথে সম্পর্ক রাখে, তাদের কাছেও পর্দা করা ওয়াজিব। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বর্ণিত হাদীসে আছে, জনৈক খুনসা বা হিজড়া ব্যাক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের কাছে আসা-যাওয়া করত। রাসূলের স্ত্রীগণ তাকে আয়াতে বর্ণিত

عَيْرِاوُلىِ الْاِرْبَةِمِنَ الرِّجِالِ

এর অন্তর্ভুক্ত মনে করে তার সামনে আগমন করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে গৃহে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দিলেন। [দেখুন, মুসলিমঃ ২১৮০] এ কারণেই কোন কোন আলেম বলেনঃ পুরুষ যদিও পুরুষত্বহীন, লিঙ্গকর্তিত অথবা খুব বেশী বৃদ্ধ হয়, তবুও সে عَيْرِاوُلىِ الْاِرْبَةِ শব্দের অন্তর্ভুক্ত নয়। তার কাছে পর্দা করা ওয়াজিব। এখানে عَيْرِاوُلىِ الْاِرْبَةِ শব্দের সাথে اَوِالتّٰبِعِيْنَ শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, নির্বোধ ইন্দ্রিয়বিকল লোক, যারা অনাহূত গৃহে ঢুকে পড়ে, তারা ব্যতিক্রমভুক্ত। [দেখুন-তাবারী, কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]

(৮) দ্বাদশ প্রকার اَوِلطِّفْلِ এখানে এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক বালককে বুঝানো হয়েছে, যে এখনো সাবালকত্বের নিকটবর্তীও হয়নি এবং নারীদের বিশেষ আকর্ষণ, কমনীয়তা ও গতিবিধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর। যে বালক এসব অবস্থা সম্পর্কে সচেতন, সে ‘মোরাহিক' অর্থাৎ সাবালকত্বের নিকটবর্তী। তার কাছে পর্দা করা ওয়াজিব। [ইবন কাসীর]

(৯) অর্থাৎ নারীরা যেন সজোরে পদক্ষেপ না করে, যার দরুন অলঙ্কারাদির আওয়াজ ভেসে উঠে এবং তাদের বিশেষ সাজ-সজ্জা পুরুষদের কাছে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। [ফাতহুল কাদীর]। এখানে মূল উদ্দেশ্য নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গাদি ও সেগুলোর সৌন্দর্য প্রকাশ হয়ে পড়ার যাবতীয় বস্তুই নিষেধ করা। অনুরূপভাবে দৃষ্টি ছাড়া অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোকে উত্তেজিতকারী জিনিসগুলোও আল্লাহ্‌ তা‘আলা মহিলাদেরকে যে উদ্দেশ্যে সাজসজ্জা ও সৌন্দর্যের প্রকাশনী করতে নিষেধ করেছেন তার বিরোধী। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদেরকে খোশবু লাগিয়ে বাইরে বের না হবার হুকুম দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “আল্লাহ্‌র দাসীদেরকে আল্লাহ্‌র মসজিদে আসতে নিষেধ করো না। কিন্তু তারা যেন খোশবু লাগিয়ে না আসে।” [আবু দাউদঃ ৫৬৫, মুসনাদে আহমাদঃ ২/৪৩৮] অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন “যে মেয়ে মসজিদে খোশবু মেখে আসে তার সালাত ততক্ষণ কবুল হয় না যতক্ষণ না সে বাড়ি ফিরে ফরয গোসলের মত গোসল করে।” [আবু দাউদঃ ৪১৭৪, ইবনে মাজাহঃ ৪০০২, মুসনাদে আহমাদঃ ২/২৪৬] আবু মূসা আশআরী বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যে নারী আন্তর মেখে পথ দিয়ে যায়, যাতে লোকেরা তার সুবাসে বিমোহিত হয়, সে এমন ও এমন। তিনি তার জন্য খুবই কঠিন শব্দ ব্যবহার করেছেন।” [আবু দাউদঃ ৪১৭৩, মুসনাদে আহমাদঃ ৪/৪০০]।

তদ্রুপ নারীরা প্রয়োজন ছাড়া নিজেদের আওয়াজ পুরুষদেরকে শোনাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাও অপছন্দ করতেন। প্রয়োজনে কথা বলার অনুমতি কুরআনেই দেয়া হয়েছে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্ৰ স্ত্রীগণ নিজেরাই লোকদেরকে দ্বীনী মাসায়েল বর্ণনা করতেন। কিন্তু যেখানে এর কোন প্রয়োজন নেই এবং কোন দ্বীনী বা নৈতিক লাভও নেই সেখানে মহিলারা নিজেদের আওয়াজ ভিন্‌ পুরুষদেরকে শুনাবে এটা পছন্দ করা হয়নি। কাজেই সালাতে যদি ইমাম ভুলে যান তাহলে পুরুষদেরকে সুবহানাল্লাহ বলার হুকুম দেয়া হয়েছে কিন্তু মেয়েদেরকে এক হাতের উপর অন্য হাত মেরে ইমামকে সতর্ক করে দেবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। [দেখুন, বুখারীঃ ১২০৩, মুসলিমঃ ৪২১, ৪২২]।

(১০) অর্থাৎ মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহ্‌র কাছে তাওবাহ কর। [কুরতুবী] হাদীসে এসেছে, তাওবাহ হলো, অনুতপ্ত হওয়া, অনুশোচনা করা, [ইবনে মাজাহঃ ৪২৫২]

এ বিধানগুলো নাযিল হবার পর কুরআনের মর্মবাণী অনুযায়ী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামী সমাজে অন্য যেসব সংস্কারমূলক বিধানের প্রচলন করেন তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হচ্ছেঃ

একঃ মাহরাম আত্মীয়ের অনুপস্থিতিতে অন্য লোকেরা (আত্মীয় হলেও) কোন মেয়ের সাথে একাকী সাক্ষাত করতে ও তার কাছে নির্জনে বসতে পারে না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যেসব নারীর স্বামী বাইরে গেছে তাদের কাছে যেয়ো না। কারণ শয়তান তোমাদের মধ্য থেকে প্রত্যেকের রক্ত ধারায় আবর্তন করছে।” [তিরমিযীঃ ১১৭২] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ ও আখেরাতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন কখনো কোন মেয়ের সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ না করে যতক্ষণ না ঐ মেয়ের কোন মাহরাম তার সাথে থাকে। কারণ সে সময় তৃতীয়জন থাকে শয়তান।” [মুসনাদে আহমাদঃ ১/১৮]

দুইঃ কোন পুরুষের হাত কোন গায়ের মাহরাম মেয়ের গায়ে লাগুক এটাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৈধ করেননি। তাই তিনি পুরুষদের হাতে হাত রেখে বাই‘আত করতেন। কিন্তু মেয়েদের বাই‘আত নেবার সময় কখনো এ পদ্ধতি অবলম্বন করতেন না। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত কখনো কোন ভিন মেয়ের শরীরে লাগেনি। তিনি মেয়েদের থেকে শুধুমাত্ৰ মৌখিক শপথ নিতেন এবং শপথ নেয়া শেষ হলে বলতেন, যাও তোমাদের বাই‘আত হয়ে গেছে।” [বুখারীঃ ৫২৮৮, মুসলিমঃ ১৮৬৬]

তিনঃ মেয়েদের মাহরাম ছাড়া একাকী অথবা গায়ের মাহরামের সাথে সফর করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “কোন পুরুষ যেন মহিলার সাথে একান্তে সাক্ষাৎ না করে যতক্ষণ তার সাথে তার মাহরাম না থাকে এবং কোন মহিলা যেন সফর না করে যতক্ষণ না তার কোন মাহরাম তার সাথে থাকে।” [বুখারীঃ ১৮৬২, ৩০০৬, ৩০৬১, ৫২৩৩, মুসলিমঃ ১৩৪১]

3 আল-বায়ান ফাউন্ডেশন | Tafsir Bayaan Foundation

আর মুমিন নারীদেরকে বল, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজদের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাই এর ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, অধীনস্থ যৌনকামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।

4 মুহিউদ্দীন খান | Muhiuddin Khan

ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ, ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো আছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।

5 জহুরুল হক | Zohurul Hoque

আর মুমিন নারীদের বলো যে তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে, আর তাদের আঙ্গিক কর্তব্যাবলীর হেফাজত করে, আর তাদের অঙ্গশোভা যেন প্রদর্শন না করে শুধু তার মধ্যে যা প্রকাশ হয়ে থাকে তা ভিন্ন, আর যেন তারা তাদের মাথার কাপড় দিয়ে তাদের বুকের উপরটা ঢেকে রাখে, আর তারা যেন তাদের শোভা-সৌন্দর্য প্রদর্শন করে না শুধু তাদের স্বামীদের অথবা তাদের পিতাদের অথবা তাদের শ্বশুরদের অথবা তাদের পুত্রদের অথবা তাদের সৎপুত্রদের অথবা তাদের ভাইদের অথবা তাদের ভ্রাতুস্পুত্রদের অথবা তাদের ভাগনেদের অথবা তাদের পরিচারিকাদের অথবা তাদের ডান হাত যাদের ধরে রেখেছে, অথবা পুরুষ চাকর-নকর যাদের কাম-লালসা নেই, অথবা ছেলেপিলেদের যাদের নারীদের গোপন অঙ্গ সন্বন্ধে জ্ঞানবোধ হয় নি, এমন লোকদের ভিন্ন, আর তাদের পা দিয়ে যেন তারা আঘাত না করে যাতে তাদের অলংকারের যা লুকিয়ে আছে তা জানানো যায়। আর হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে মিলে আল্লাহ্‌র দিকে ফেরো যেন তোমাদের সফলতা অর্জন হয়।